কক্সবাজারের টেকনাফে দুর্গম পাহাড়ে গড়ে ওঠা মানবপাচারকারীদের গোপন আস্তানা ও বন্দিশালা উচ্ছেদে ফের বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী। পাহাড়ের একটি এলাকায় তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপরতা বাড়িয়েছেন। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে সেনা, বিজিবি ও পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য অংশ নিয়েছেন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-রঙ্গীখালী সংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
এর আগে শুক্রবার পাহাড়ের গোপন বন্দিশালা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৭ জনকে টেকনাফ মডেল থানার প্রাঙ্গণে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫১ জন বাংলাদেশি এবং ছয়জন রোহিঙ্গা রয়েছেন।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, রঙ্গীখালীর পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধারের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার সত্যতা অনুসন্ধানে পুলিশ কাজ করছে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, মানবপাচারকারী চক্রের দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় কয়েকজন নিহত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। বন্দিশালার কাছাকাছি তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে নিহত ব্যক্তিরা পাচারকারী চক্রের সদস্য, নাকি বন্দিদশা থেকে পালানোর চেষ্টা করা ভুক্তভোগী, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনি।
এদিকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাহাড়ের বন্দিশালায় আটকে রাখা, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান জানান, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কক্সবাজারে আনা হয়েছিল। পরে একটি দুর্গম পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে টানা আট দিন বন্দি থাকার সময় দুবার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি তিনি।
তার দেওয়া তথ্যমতে, ওই বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। সশস্ত্র ব্যক্তিরা পাহারা দেওয়ায় বন্দিদের বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এমনকি তাদের মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টেকনাফের দুর্গম পাহাড়কে দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারকারী চক্র নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিদেশে চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সংগ্রহ করে পাহাড়ে আটকে রাখা হয়। পরে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় অথবা সাগরপথে অবৈধভাবে পাচারের চেষ্টা করা হয়।
পাহাড়ে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকার খবর এবং সশস্ত্র অপরাধীদের উপস্থিতির আশঙ্কায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অপরাধী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত, গোপন বন্দিশালা উচ্ছেদ এবং পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথবাহিনীর অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযান শেষে মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের নেটওয়ার্ক ও তাদের সহযোগীদের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

