রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিটটির স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের (পিওআরভি/পিওএসভি) সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
শেষ হলো গুরুত্বপূর্ণ ভালভ পরীক্ষা
কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহৃত চাপ প্রশমন ভালভগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে কয়েক ধাপে পরীক্ষা চালানো হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ মেগাপ্যাসকেল পরিচালন চাপ এবং ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ মেগাপ্যাসকেল চাপ প্রয়োগ করে পরীক্ষা চালানো হলে শুরুতে কিছুটা জটিলতা দেখা দেয়। নির্ধারিত চাপের পর্যায়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভালভ একসঙ্গে খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রথম প্রচেষ্টায় তা হয়নি।
পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।
রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তা
এর আগে ভালভে সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানে নির্মাণ সহযোগী দেশ রাশিয়ার সহায়তা চায় বাংলাদেশ। পরে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরে এসে ত্রুটিপূর্ণ নয়টি ভালভ মেরামতের কাজ সম্পন্ন করে।
মেরামত শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন চাপ ও তাপমাত্রায় ধাপে ধাপে ভালভগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত চাপের পরিস্থিতিতে ভালভগুলো যথাসময়ে খুলে রিঅ্যাক্টরকে নিরাপদ রাখার সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
কেন্দ্র-সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৮ দশমিক ১ মেগাপ্যাসকেল চাপের পর্যায়েও তিনটি ভালভের কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পরীক্ষায় প্রথম ভালভের নির্ধারিত সময়ে খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করা হয় এবং সেটিও সফল হয়েছে।
সামনে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’
ভালভের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর রূপপুরের প্রথম ইউনিটের সামনে এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এই ধাপে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমোদন প্রয়োজন।
অনুমোদন পাওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে। এর মধ্য দিয়ে রিঅ্যাক্টর পরীক্ষামূলক ও সক্রিয় পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটিতে নেওয়া হবে। এই পর্যায়েই প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে।
তখন রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সিস্টেম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
এরপর বাড়বে উৎপাদনক্ষমতা
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ সফলভাবে শেষ হলে কেন্দ্রটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে যাবে। এ সময় ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে টারবাইন সিনক্রোনাইজেশন এবং জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এ পর্যায়ে কেন্দ্রের অপারেটিং অর্গানাইজেশনকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে নিরাপদে যুক্ত করার পর প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩ শতাংশে নেওয়া হবে। এরপর ধাপে ধাপে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব পরীক্ষা সন্তোষজনক হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। উৎপাদন শুরুর পরও প্রায় সাত থেকে আট মাস পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলতে পারে।
সমন্বয়ই বড় চ্যালেঞ্জ
পাওয়ার স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরের বিভিন্ন সরকারি ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বায়রা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, সামরিক বাহিনী, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থা এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের জন্য নতুন অধ্যায়
রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুধু দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সক্ষমতা যোগ করবে না, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মূল মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে দুই দফায় সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির প্রভাবে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
সবশেষে বলা যায়, প্রথম ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ায় রূপপুর এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরও কাছাকাছি। সামনে বায়রার অনুমোদন, ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি এবং পর্যায়ক্রমে পাওয়ার স্টার্ট-আপের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার হলেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের পথ খুলবে।

