চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বরের আগেই গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ পুনর্বহাল করাকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর মিলনায়তনে আয়োজিত ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, গঙ্গা চুক্তির বর্তমান মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এর আগেই নতুন চুক্তি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের বৈঠক ও আলোচনার অগ্রগতির ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।
১৯৭৭ সালে তৎকালীন সময়ে প্রথমবারের মতো গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে নতুন করে চুক্তি হলেও সেখানে ওই ধারা রাখা হয়নি। এবার নতুন চুক্তিতে সেই নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ-এমনটাই জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী।
এদিকে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়েও আশার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে যাবে। মন্ত্রীর ভাষায়, পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প, যার সুফল দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী পাবে।
তিস্তা বহুমুখী প্রকল্প নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে আগামী বছর মূল কাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, তিস্তা একটি খরস্রোতা নদী এবং উজান থেকে আসা পানির প্রবাহের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নদী তীরবর্তী মানুষ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাই বড় আকারের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে তিস্তা প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করে মূল প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্পে বিদেশি কোনো চাপ রয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, এসব প্রকল্পে সরকারের মূল বিবেচনা দেশের মানুষের স্বার্থ। পদ্মা ও তিস্তা নদীর তীরবর্তী মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পানিসম্পদমন্ত্রী আরও বলেন, পদ্মা ব্যারাজের সমীক্ষা শেষ করতেই ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে পানি বণ্টন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ একটি কমিটি গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বৃহস্পতিবার একই সেমিনারের উদ্বোধনী পর্ব শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে চায়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের সমর্থন বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও নিয়মিত সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন।
হুমায়ুন কবির জানান, আলোচনার জন্য বাংলাদেশ তার কমিটি গঠন করেছে এবং ভারতীয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নাম চাওয়া হয়েছে। ভারতের জবাব পাওয়ার পর দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে বলে জানান তিনি।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ। দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব থাকলে আলোচনার মাধ্যমেই পানি নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন, ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং পুরোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।

