পুলিশ কর্মকর্তার ফ্ল্যাটে বছরজুড়ে ডিজে পার্টি, অতিষ্ঠ আবাসিকরা; ক্লোজ অতিরিক্ত ডিআইজি

মাসে ২০–২২ দিন চলত আয়োজন, ৮৫ জন আটক; কারাদণ্ড ও জরিমানা, তদন্তে ডিবি

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক:রাজধানীর খিলক্ষেতের পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটিতে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে ডিজে পার্টির আয়োজন চলছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, নাচ ও মাদক সেবনের এসব আয়োজনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন আবাসিক এলাকার অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় এক বছর ধরে মাসে ২০ থেকে ২২ দিন এসব পার্টি হতো। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও অভিযোগ করেছিলেন বাসিন্দারা।

- Advertisement -

গত সোমবার রাতে ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৭ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযানে মদ, ইয়াবা, সিসা সেবনের সরঞ্জাম এবং গাঁজাসদৃশ পদার্থ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর ফ্ল্যাটটির মূল হোস্ট হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে ক্লোজ করার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এসব পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন করা হতো। ফ্ল্যাটটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন কো-হোস্ট মাহবুবুল আলম। তবে পার্টির আয়োজন, অর্থের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ঘটনাটি তদন্ত করছে।

বুধবার মিন্টো রোডে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির। তিনি বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানের আগে তাঁর কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। পরে তাঁকে অভিযানে যুক্ত করা হয়।

মসজিদের আশপাশেও শোনা যেত গান

অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হাউজিং সোসাইটির ভেতরে একটি মসজিদের আশপাশ থেকেও উচ্চ শব্দে গান শোনা যাচ্ছিল। পার্টির দিন সেখানে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। ফ্ল্যাটে গিয়ে পুলিশ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারসহ ২৬ জন তরুণীকে পায়। কয়েকটি কক্ষে নারী-পুরুষকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। পুলিশের দাবি, সেখানে সিসা সেবন, উচ্চ শব্দে গান ও অশালীন নাচ চলছিল।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পার্টিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দৌড়ে ভবনের ওপরের তলায় চলে যান বলে জানান ডিসি ইলিয়াস কবির।

হাউজিং সোসাইটিতে বসবাসকারী কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এসব পার্টির কারণে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল। রাতের উচ্চ শব্দে আশপাশের বাসিন্দাদের অসুবিধা হতো। এ নিয়ে তাঁরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অভিযোগও করেছিলেন বলে অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন, মাসে ২০–২২টি পার্টি

ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন করা হতো। ফ্ল্যাটটির মূল হোস্ট ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। কো-হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন মাহবুবুল আলম।

মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিসি বলেন, ২০২৫ সাল থেকে ফ্ল্যাটটিতে এ ধরনের আয়োজন হয়ে আসছিল। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

অর্থ আদায়ের বিষয়ে ইলিয়াস কবির জানান, ১০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হতো বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ৯০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়ার হিসাবও তুলে ধরেন তিনি।

তবে এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হতো, আয় থেকে কারা কত টাকা পেতেন এবং ফ্ল্যাটের মালিকের সঙ্গে ব্যবস্থাপকের আর্থিক লেনদেন কীভাবে হতো, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি। এসব হিসাবের সত্যতা ও অর্থের উৎস-ব্যবহার তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।

উদ্ধার মদ, ইয়াবা ও সিসা সেবনের সরঞ্জাম

অভিযানে উদ্ধার করা সামগ্রীর তালিকায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদের বোতল রয়েছে। এর মধ্যে এক লিটারের একটি পূর্ণ আইকোনিক হোয়াইট হুইস্কির বোতল, এক লিটারের রয়্যাল স্ট্যাগের বোতলে আনুমানিক ৫০০ মিলিলিটার এবং এক লিটারের স্মিরনফ ভদকার বোতলে আনুমানিক ২০০ মিলিলিটার মদের উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ৭৫০ মিলিলিটারের কেরুজ ইম্পেরিয়াল হুইস্কির একটি খালি বোতল উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের তালিকায় একটি ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, অল্প পরিমাণ গাঁজাসদৃশ পদার্থ এবং কনডম উদ্ধারের কথাও উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে ডিবি জানিয়েছে, অভিযানে মদ, সিনথেটিক মাদক, সিসা ও বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে।

৮৫ জন আটকের তথ্য, সাজা পেয়েছেন ৮৩ জন

ডিসি ইলিয়াস কবিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৭ জন তরুণকে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

অন্যদিকে ২৬ জন তরুণীকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের আরও তিন দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আটক ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাঁদের অভিভাবকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে জানান ডিসি।

তবে আটকের সংখ্যা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। প্রথমে ৮৫ জনকে আটকের কথা জানানো হলেও সাজাপ্রাপ্ত হিসেবে ৫৭ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণীর তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মোট সংখ্যা ৮৩। বাকি দুজনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রভাবশালীদের সন্তানদের উপস্থিতির অভিযোগ

অভিযানে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এসব পার্টিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদের যাতায়াত ছিল। তাঁদের কয়েকজনকে তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এ দাবির পক্ষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এ ছাড়া চট্টগ্রামে কর্মরত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন সদস্য ওই পার্টিতে ছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সেনাবাহিনী নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

দায় অস্বীকার জহিরের, দাবি ভাড়ার টাকা পান তিনি

ফ্ল্যাটটির মূল হোস্ট হিসেবে নিজের নাম থাকা এবং পার্টি থেকে আয়ের ৭০ শতাংশ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির মালিক মূল হোস্ট হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকেন। তবে তিনি নিজে এসব পার্টির আয়োজন করতেন না। ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে।

জহিরের দাবি, মাহবুবুল আলমকে নিয়মকানুন মেনে চলতে এবং কোনো অনিয়ম হলে তাঁকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনে অনুষ্ঠান বাতিল করার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারছেন, মাহবুব তাঁকে অনেক বিষয় জানাননি।

পার্টি থেকে আয়ের ৭০ শতাংশ পাওয়ার বিষয়ে জহির বলেন, ওই অর্থ তাঁর ফ্ল্যাটের ভাড়া। অবশিষ্ট অর্থের একটি অংশ মাহবুবুল আলম পান। হাউসকিপিংয়ের কর্মী ও মালি এ আয় থেকে অর্থ পেতেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে পার্টির প্রকৃত আয়, অর্থ বণ্টনের হিসাব এবং আয়োজন সম্পর্কে ফ্ল্যাটের মালিক কতটা অবগত ছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ক্লোজ অতিরিক্ত ডিআইজি, তদন্ত করছে ডিবি

অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিসি ইলিয়াস কবির বলেন, আব্দুল্লাহ আল জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। তাঁর ভাষ্য, এ ঘটনায় মামলা হয়নি। পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ফ্ল্যাটটির মালিক হিসেবে জহিরের নাম প্রকাশ্যে আসার পর তাঁকে ক্লোজ করার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, ডিবি বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তে জহিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

ঘটনাটি ঘিরে এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক এলাকায় এমন আয়োজন কীভাবে চলেছে, অভিযোগের পরও কেন তা বন্ধ হয়নি, পার্টি থেকে পাওয়া অর্থের প্রকৃত হিসাব কী এবং আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কার কী ভূমিকা ছিল। ডিবির তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

সর্বশেষ