ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনা: জন্মদিনে স্মরণ বিশ্বজয়ী এক কিংবদন্তিকে

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক : ফুটবল মাঠে তাঁর পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে কয়েক প্রজন্মের দর্শক। কখনো দুর্দান্ত ড্রিবলিং, কখনো অবিশ্বাস্য গোল, আবার কখনো একক নৈপুণ্যে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া—সব মিলিয়ে ফুটবল ইতিহাসে নিজের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। আজ ৩০ অক্টোবর তাঁর ৬৬তম জন্মবার্ষিকী। জীবদ্দশায় ফুটবলকে ঘিরে যে আবেগ ও উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন, মৃত্যুর ছয় বছর পরও তা অমলিন।

- Advertisement -

১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার লানুসে জন্মগ্রহণ করেন ম্যারাডোনা। শৈশব কেটেছে বুয়েনস এইরেসের দরিদ্র এলাকা ভিলা ফিওরিতোতে। আর্থিক সংকটের মধ্যেও ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান। অল্প বয়সেই প্রতিভার পরিচয় দেন তিনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার ক্লাব আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটে তাঁর।

এরপর বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা ও ইতালির নেপোলির মতো ক্লাবে খেলেছেন এই তারকা। তবে নেপোলিতে কাটানো সময়ই তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর নেতৃত্ব ও অসাধারণ পারফরম্যান্সে ইতালীয় ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে ক্লাবটি। ১৯৮৭ ও ১৯৯০ সালে নেপোলিকে সিরি ‘আ’ শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই ক্লাবটি ইউরোপীয় ফুটবলে পরিচিতি ও সাফল্য পায়।

ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জেতান তিনি। পুরো আসরে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল অর্জন করেন।

বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের দুটি গোল তাঁকে ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে। ম্যাচের ৫১ মিনিটে হাত দিয়ে করা গোলটি ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়। এর মাত্র চার মিনিট পর নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একে একে পাঁচ ইংলিশ খেলোয়াড় ও গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে কাটিয়ে গোল করেন তিনি। পরে গোলটি ফিফার শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

খেলার মাঠের বাইরে বিতর্কও পিছু ছাড়েনি ম্যারাডোনার। মাদকাসক্তি, শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা ও নানা বিতর্কের কারণে তাঁর ক্যারিয়ার বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপেও নিষিদ্ধ ওষুধ পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার পর তাঁকে টুর্নামেন্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবু তাঁর ফুটবলীয় প্রতিভা ও অবদান নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা থামেনি।

২০০০ সালে ফিফার শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় নির্বাচনে পেলের সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেন ম্যারাডোনা। ফুটবলের প্রতি তাঁর অবদান, মাঠের অসাধারণ দক্ষতা এবং বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের ওপর প্রভাব তাঁকে ক্রীড়াজগতের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান ম্যারাডোনা। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ব ফুটবলে নেমে আসে শোকের ছায়া। আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন দেশের ফুটবলার, ক্লাব ও সমর্থকেরা শ্রদ্ধা জানান এই কিংবদন্তিকে।

ম্যারাডোনা আজ আর মাঠে নেই। কিন্তু ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই অসাধারণ গোল, নেপোলির হয়ে তাঁর সাফল্য এবং বল পায়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। জন্মদিনে তাই তাঁকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফিরে আসে পুরোনো স্মৃতি, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। ফুটবলের ইতিহাসে ম্যারাডোনা এমন এক নাম, যাঁর প্রভাব সময়ের সঙ্গে মুছে যাওয়ার নয়।

সর্বশেষ