আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্রের ৯০টি উৎক্ষেপণব্যবস্থা সরবরাহে সম্মত হয়েছে রাশিয়া। রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ নথিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব অস্ত্র ইরানের কাছে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিমপেলের উৎপাদনসংক্রান্ত নথিতে ইরানের জন্য এসব উৎক্ষেপণব্যবস্থা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে তৈরি একটি উৎপাদন পরিকল্পনায় ‘কে-১০’ সাংকেতিক নামে বিদেশি এক ক্রেতার জন্য ৯০টি উৎক্ষেপণব্যবস্থা সরবরাহের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনএক্সপোর্টের নথিতে ‘কে-১০’ সংকেতটি ইরানকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ভিমপেলের উৎপাদনসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের বেসরকারি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ডালাস অ্যানালিটিকস এসব নথি সংগ্রহ করে দ্য গার্ডিয়ানকে সরবরাহ করেছে।
নথি অনুযায়ী, ইরানের জন্য বরাদ্দ করা অস্ত্রব্যবস্থাগুলো হলো এলএমইউআর ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণব্যবস্থা। ক্ষেপণাস্ত্রটি ‘ইজদেলিয়ে ৩০৫’ নামেও পরিচিত। ২০২৪ সালের মে মাসে ভিমপেল একটি চিঠিতে উৎক্ষেপণব্যবস্থার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দ্রুত সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছিল। ওই চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত উৎপাদন পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব ব্যবস্থা সরবরাহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
যে সক্ষমতা বাড়াতে পারে ইরানের
এলএমইউআর ক্ষেপণাস্ত্র নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম। চলমান লক্ষ্যবস্তুকেও লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে এটি। রাশিয়ার এমআই-২৮ আক্রমণকারী হেলিকপ্টারে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ইরানের সামরিক বাহিনীর কাছেও এ ধরনের হেলিকপ্টার রয়েছে। ফলে রুশ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের হাতে গেলে দেশটির আকাশ থেকে স্থলভাগে নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়তে পারে।
ফাঁস হওয়া নথির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একই ধরনের একটি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সূচিতে ২০২৩ সালে ইরানের জন্য ছয়টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান তৈরির তথ্য রয়েছে। প্রকাশ্যে আসা বিমান সরবরাহের খবরের সঙ্গে নথির এই তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।
তবে ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থার চুক্তি থাকলেও সেগুলো বাস্তবে ইরানে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে নথিতে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ফলে সরবরাহের পরিকল্পনা ও বাস্তব সরবরাহের বিষয়টি আলাদা করে দেখার সুযোগ রয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যে মস্কোর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক লাভ
রাশিয়া-ইরানের এই সামরিক সহযোগিতার তথ্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন হিসাব-নিকাশ চলছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত রাশিয়ার জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এতে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য থেকে বাড়তি রাজস্ব পেতে পারে। এই অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধে সামরিক ব্যয় নির্বাহে ক্রেমলিনকে সহায়তা করার পাশাপাশি দেশটির বাজেটের ওপর চাপ কমাতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের কাছে রাশিয়ার ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা সরবরাহের পরিকল্পনা দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের গভীরতার নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট তৈরি করছে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলছে।

