spot_imgspot_img

সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪২৩, ৩৩ শতাংশ বাইক আরোহী

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সড়কগুলোতে ৪৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৩ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৬৭৪ জন। নিহতদের মধ্যে ১৩৯ জন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

- Advertisement -

রোববার প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৫৪টি। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন। একই সময়ে পথচারী নিহত হয়েছেন ১০৬ জন, যা মোট প্রাণহানির ২৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। এছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন।

সড়ক দুর্ঘটনার বাইরে সেপ্টেম্বর মাসে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন সাতজন এবং নিখোঁজ রয়েছেন চারজন। একই সময়ে ২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।

আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনা বেশি

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এ ধরনের সড়কে ১৭৮টি দুর্ঘটনা হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ।

এ ছাড়া জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ১৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। পথচারীকে চাপা দেওয়া বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা রয়েছে ১০৯টি। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৯৮টি এবং অন্য যানবাহনের পেছনে ধাক্কার ঘটনা ঘটেছে ৬১টি। বাকি ছয়টি দুর্ঘটনা অন্যান্য কারণে হয়েছে।

দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের অংশ ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। পণ্যবাহী বিভিন্ন যানবাহনের অংশ ২৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। থ্রি-হুইলারের অংশ ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং যাত্রীবাহী বাসের অংশ ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

ঢাকা বিভাগে প্রাণহানি সর্বোচ্চ

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বর মাসে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি—দুই দিক থেকেই এগিয়ে ঢাকা বিভাগ। সেখানে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে। ওই বিভাগে ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে গাজীপুরে। সেখানে নিহত হয়েছেন ৩৮ জন। রাজধানী ঢাকায় ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থীও উল্লেখযোগ্য

নিহতদের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে ৫৮ জন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের ২৫ জন ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলের ২৪ জন নেতাকর্মী, ২১ জন পণ্য বিক্রয় প্রতিনিধি, ১৮ জন এনজিওকর্মী, ১৪ জন দিনমজুর ও ১৩ জন শিক্ষক নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া ব্যাংক ও বিমা খাতের ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, দুই পুলিশ সদস্য, একজন সেনাসদস্য, তিন সাংবাদিক, দুই চিকিৎসক এবং চার প্রকৌশলীও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

অতিরিক্ত গতিকে বড় কারণ বলছে সংস্থাটি

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে তারা। পাশাপাশি পথচারী নিহতের সংখ্যা কমাতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, অনিয়মিত বেতন ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল এবং তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো—এসব কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

এর পাশাপাশি ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

নিরাপদ সড়কে একাধিক সুপারিশ

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন এবং বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া যানবাহনে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, দক্ষ চালক তৈরি, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছে তারা।

রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা কমাতে সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, একই সঙ্গে কার্যকর নীতিমালা, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।

spot_imgspot_img
spot_imgspot_img

সর্বশেষ