হরমুজ প্রণালিতে চার দেশকে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে ইরান, থাকছে ট্রানজিট ফি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে চারটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে ইরান। দেশগুলো হলো ভারত, চীন, ইরাক ও কাতার। তবে এই সুবিধার আওতায় সব দেশকে একই ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ভারত ও চীনের জাহাজকে ট্রানজিট ফি দিতে হলেও কাতারের জাহাজ চলাচল করছে বিনা শুল্কে। ইরাকের ক্ষেত্রে ফি নেওয়া হচ্ছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

- Advertisement -

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সিকে (আইএসএনএ) দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে চলাচল করছে। যুক্তরাষ্ট্রও এসব জাহাজে বাধা দিচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক হিসাব। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং চলমান যুদ্ধের কারণে চাপে থাকা তেহরান প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি, বাণিজ্য সচল রাখা এবং রাজস্ব আয়ের বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা করছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নতুন করে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে চার দেশের জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দেওয়া তেহরানের জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইরানি আইনপ্রণেতা আমির হায়াত মোঘাদ্দামের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে ওষুধ এবং চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি এই ছাড়ের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ জাহাজ চলাচলের সুবিধার বিনিময়ে ইরান প্রয়োজনীয় পণ্য ও কূটনৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে চাইছে। অন্যদিকে, ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষক রুজবেহ পারসি মনে করেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে পণ্য বিনিময় ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে বাণিজ্য পরিচালনা ইরানের জন্য নতুন কোনো কৌশল নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের প্রধান লক্ষ্য হলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মধ্যেও প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা আদান-প্রদানের পথ সচল রাখা।

অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে চালু রাখা গেলে ইরান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশের ক্রেতা চীন।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ওপর ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত অক্টোবর মাসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।

ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলে দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভারত ইরানের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ফলে দুই দেশের মধ্যে এই বাণিজ্যিক নির্ভরতা বিশেষ ছাড়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে।

কাতারের ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্ন হিসাব। জ্বালানি রপ্তানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে দেশটি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। অন্যদিকে, ইরাকের সঙ্গে তেহরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এপ্রিলে ইরানের সামরিক কমান্ড ইরাককে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দেশ হিসেবে উল্লেখ করে দেশটির জাহাজ চলাচলে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিশেষ সুবিধা কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। ওয়াশিংটন যদি নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি মেনে নেয়, তাহলে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের জাতীয়তা নির্ধারণের বিষয়টিও অস্পষ্ট। জাহাজের পতাকা, প্রকৃত মালিকানা নাকি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের ভিত্তিতে এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।

এদিকে, তেলের বাজারে ইরানের এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে যুদ্ধের উত্তেজনা আবার বাড়লে বিশেষ ছাড় পাওয়া জাহাজগুলোর নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকবে না।

এরই মধ্যে গত ৩০ অক্টোবর উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ ‘আল মায়েদা’ অজ্ঞাত একটি বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা এবং যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনাকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে চার দেশের জন্য ইরানের এই বিশেষ ব্যবস্থা একদিকে যেমন বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সর্বশেষ