spot_imgspot_img

ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে পারমাণবিক বিদ্যুৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভালভের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সামনে আরও উচ্চচাপে পরীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় ধাপগুলো শেষ করা গেলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

- Advertisement -

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কার্যক্রম প্রায় দুই মাস পিছিয়ে যায়।

গত বুধবার ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষার মাধ্যমে ভালভগুলো নির্ধারিত পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। এর আগে অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণসহ সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলোও পরীক্ষা করে দেখা হয়।

কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, চুল্লির ভেতরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ভালভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে প্রথম ইউনিট চালুর আগে ভালভের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ—উভয় জায়গা থেকেই পরীক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

পরীক্ষার সময় ভালভের খোলা ও বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং চাপ ও তাপমাত্রার বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। এখন ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করার প্রস্তুতি চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, মেগাপ্যাসকেল চাপ পরিমাপের একটি একক। চুল্লিপাত্রে স্বাভাবিক চাপ ১৬ মেগাপ্যাসকেল হলেও উচ্চচাপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করাও জরুরি। ১৮ মেগাপ্যাসকেলের পরীক্ষা সফল হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে। তার মতে, আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা ভালভ পরীক্ষার পর চূড়ান্ত পর্যায়ের আরও কয়েকটি পরীক্ষা বাকি রয়েছে। এগুলো শেষ হলে চুল্লিতে তাপশক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। উৎপন্ন তাপের মাধ্যমে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং সেখান থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

জ্বালানি নিয়ে নেই অনিশ্চয়তা

রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা অনিশ্চয়তার কথা শোনা গেলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। প্রথম ইউনিটের প্রয়োজনীয় সব জ্বালানি ২০২৩ সালেই রূপপুরে পৌঁছেছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজও শেষ হয়।

সম্প্রতি প্রথম ইউনিটের জন্য আরও একটি অতিরিক্ত জ্বালানির চালান রূপপুরে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানিও প্রস্তুত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান শিগগিরই দেশে আসতে পারে। সব মিলিয়ে এ পর্যায়ে আরও নয়টি চালান আসার কথা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক জ্বালানি সহজে তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করা যায় না। তাই প্রয়োজনের আগেই পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রাখা জরুরি। প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরুর পর কোনো জ্বালানি অ্যাসেম্বলিতে সমস্যা দেখা দিলে যাতে দ্রুত তা পরিবর্তন করা যায়, সে জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, একটি ত্রুটির কারণে প্রকল্পের কাজ প্রায় দুই মাস পিছিয়েছে। বর্তমানে কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে এবং জ্বালানি নিয়েও কোনো অনিশ্চয়তা নেই। অল্প কয়েকটি পরীক্ষা শেষ হলেই পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানান তিনি। ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে বলেও জানান মন্ত্রী।

ধাপে ধাপে বাড়বে উৎপাদন

কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে চলতি মাসের শেষ নাগাদ শক্তি উৎপাদন শুরু হতে পারে। শুরুতে উৎপাদন ক্ষমতা কম রাখা হবে। ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে নেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এ পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।

গ্রিডে সংযোগের পরও রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলবে। এই পর্যায়টি প্রায় সাত থেকে আট মাস স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হবে। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

দেশের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে দুই দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

spot_imgspot_img
spot_imgspot_img

সর্বশেষ