হুথিদের আঘাতে রিয়াদ বিমানবন্দরে তোলপাড়, বন্ধ ফ্লাইট চলাচল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ উঠেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সৌদি জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। তবে হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রেখেছে।

- Advertisement -

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিমানবন্দর থেকে ধারণ করা ভিডিওতে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এ সময় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছিলেন অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা। সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে সাম্প্রতিক হামলার ধারাবাহিকতায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তাঁদের বাহিনী দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। একই অভিযানের অংশ হিসেবে নাজরান বিমানবন্দর ও খামিস মুশাইত বিমান ঘাঁটিতেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে হুথিদের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকির ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া দুটি এবং খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ফলে হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও উড়োজাহাজে আগুন লাগার কারণ নিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল

হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিমান চলাচলে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো। এয়ার ইন্ডিয়া আগামী শনিবার পর্যন্ত রিয়াদগামী এবং রিয়াদ থেকে ছেড়ে আসা সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। একই সঙ্গে লুফথানসা গ্রুপ সৌদি রাজধানীতে তাদের পরিচালিত ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে তারা অবগত রয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশটিতে কর্মরত মার্কিন সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ অনুমতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আগের হামলায় নিহত তিন, আহত অন্তত ৩৬

বৃহস্পতিবারের ঘটনার আগে চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ও বুধবারও সৌদি আরবের আভা ও কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল বলে জানিয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। ওই হামলায় তিনজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে আভায় দুজন এবং রিয়াদে একজন বিদেশি নাগরিক ছিলেন। এ ছাড়া আহত হন অন্তত ৩৬ জন, যাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

পরপর হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

তাইজে তীব্র লড়াই, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নিয়ে লড়াই

ইয়েমেনের স্থলভাগেও সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম প্রদেশ তাইজে সরকার সমর্থিত বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে লড়াই চলছে। সরকারপন্থী বাহিনী এডেন, লাহেজ ও তাইজকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথগুলোর দিকে অগ্রসর হওয়ায় হুথিরা বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির চেষ্টা করছে।

এ লক্ষ্যে আল-শামায়াতায়েন, আল-মা’ফের এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে হুথিদের অভিযান জোরদার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি আল-ওয়াজিয়াহ ও কাহবুবের পার্বত্য এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।

ইয়েমেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করার পর সামরিক কমান্ডাররা আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পশ্চিমাঞ্চলেও ধুবাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে হুথি বাহিনী। এলাকাটি এডেন-তাইজের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাল্টাপাল্টি দাবি

হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি পৃথক এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, পূর্বাঞ্চলীয় আল-জাওফ প্রদেশে তাঁদের অবস্থানের দিকে সৌদি বাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি বাহিনীর কয়েক ডজন সদস্য হতাহত হয়েছেন এবং অভিযানে সৌদি বাহিনী উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

সারি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাত বৃদ্ধির পর থেকে সৌদি আরব ও তার মিত্র বাহিনী ইয়েমেনে মোট ১ হাজার ৬৪২টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা

দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান চেয়ে তারা পরিবারের কাছ থেকে ১ হাজার ৮০০টি অনুরোধ পেয়েছে।

ইয়েমেনে আইসিআরসির প্রতিনিধিদলের প্রধান ক্রিস্টিন চিপোলা বলেছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের তাঁদের প্রিয়জনদের ভাগ্য ও অবস্থান জানার অধিকার রয়েছে। প্রতিটি নিখোঁজ ব্যক্তির পেছনে একটি পরিবার অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাঁদের দুর্ভোগ উপেক্ষা করা উচিত নয় এবং অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘায়িত হওয়া কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সামগ্রিকভাবে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার খবর, ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে তীব্র লড়াই এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের দাবি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং মানবিক সংকট আরও বাড়তে পারে।

সর্বশেষ