ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ ফজলুর রহমানের, বললেন ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের কারখানা’

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

একসময় দেশের প্রগতিশীল চিন্তাচর্চা, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ এবং জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিবেশ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্বাধীনতাবিরোধী ও অমানুষদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

- Advertisement -

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা নিয়ে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

ফজলুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে পড়াশোনা করতে যাওয়া কিংবা শিক্ষকতা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অমানুষদের জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ আছে কি না, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক অবদানের কথা তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহু কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদের জন্ম হয়েছে। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম, ড. নাজমা চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ ও হুমায়ূন আহমেদের মতো গুণী ব্যক্তিত্ব এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেও বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানান ফজলুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাম আযম ও নিজামীর ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং তাঁদের জাতির নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

বক্তব্যে দেশের ইতিহাস, জাতীয় নেতৃত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েও কথা বলেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম ও সূর্য সেনের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের অবদানের কথা স্মরণ করেন।

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বরকত, সালাম, রফিক ও জব্বারের মতো শহীদরা জীবন দিয়েছেন। একইভাবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য তরুণ পরিবার-পরিজন ছেড়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

নিজের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন প্রতিকূল আবহাওয়া ও নানা কষ্টের মধ্যে যুদ্ধ করেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই ইতিহাস ও চেতনাকে ভুলে গেলে দেশের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, তিনি আরও কয়েক বছর বেঁচে থেকে বাংলাদেশকে দেখে যেতে চান। দেশটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে এগিয়ে যাবে, নাকি পাকিস্তানপন্থি রাজাকারদের আদর্শে ফিরে যাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর দেখে যেতে চান তিনি। এ জন্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়েও উদ্বেগ জানান ফজলুর রহমান। তাঁর দাবি, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আবারও সাহসী হয়ে উঠছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হচ্ছে। এমনকি নিজের জীবন নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার কারণে তাঁকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধারা যেন স্বাধীন বাংলাদেশেই অসম্মান ও অনিরাপত্তার শিকার না হন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার মূল চেতনা রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সর্বশেষ