হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবার এক যাত্রীর কাছ থেকে ডিমের আকৃতির তিনটি প্যাকেটে রাখা সোনার পেস্ট উদ্ধার করেছে ঢাকা কাস্টম হাউস। বিশেষ কায়দায় শরীরে লুকিয়ে আনা এসব প্যাকেটে মোট ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনার পেস্ট ছিল। পরিশোধনের পর সেখান থেকে প্রায় এক কেজি সোনা পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধার করা সোনার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। বৃহস্পতিবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে আসা এয়ার অ্যারাবিয়ার একটি ফ্লাইটে এ ঘটনা ঘটে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সোনা চোরাচালানের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি জোরদার করেন ঢাকা কাস্টম হাউসের গোয়েন্দারা।
ফ্লাইটের যাত্রীরা ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শেষ করার পর ব্যাগেজ বেল্ট-২ এলাকায় এলে আরমান উদ্দীন সিদ্দিক নামের এক যাত্রীকে সন্দেহ হয় কাস্টমস কর্মকর্তাদের। পরে তাঁকে তল্লাশি করা হলে তাঁর শরীরে লুকানো অবস্থায় সাদা স্কচটেপে মোড়ানো তিনটি ডিম্বাকৃতির প্যাকেট পাওয়া যায়। এসব প্যাকেটের ভেতর ছিল সোনার পেস্ট।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনটি প্যাকেটের প্রতিটিতে ৪৩০ গ্রাম করে মোট ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনার পেস্ট ছিল। পরীক্ষায় পেস্টের বিশুদ্ধতা ২৪ ক্যারেট পাওয়া যায়। পরিশোধন শেষে এগুলো থেকে প্রায় এক কেজি সোনা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যাত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে ঢাকা কাস্টম হাউস।
চোরাচালানে বদলাচ্ছে সোনার ধরন
শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনা উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়। তবে সময়ের সঙ্গে চোরাচালানের ধরন ও সোনার বহনের অবস্থায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কখনো বার বা বিস্কুট আকৃতিতে, আবার কখনো পেস্ট কিংবা গুঁড়া অবস্থায় সোনা আনার চেষ্টা ধরা পড়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যাত্রীদের পাশাপাশি উড়োজাহাজের কর্মীদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সোনা উদ্ধার হয়েছে। উড়োজাহাজের ভেতর, যাত্রীর পোশাক এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রীর মধ্যেও সোনা পাওয়ার ঘটনা রয়েছে।
সম্প্রতি ৪ অক্টোবর দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের একটি ফ্লাইটের দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর থেকে ৮০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) অভিযানে উদ্ধার হওয়া বারগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। সেগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
এর আগে গত বছরের এপ্রিলে দুবাই থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসা একটি ফ্লাইটের এক যাত্রীর পোশাক থেকে সোনার মতো গুঁড়া উদ্ধার করা হয়েছিল। চার জোড়া অন্তর্বাস, একটি প্যান্ট ও তিনটি টি-শার্টে বিশেষভাবে লুকানো ওই পদার্থ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের পর প্রায় ২ কেজি ৪১৭ গ্রাম সোনা পাওয়া যায়।
পাঁচ বছরে বিপুল সোনা উদ্ধার
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাচালানের সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় সোনা বার, বিস্কুট, পেস্ট, গুঁড়া কিংবা অন্য অবস্থায় পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণ ৯৭ হাজার ৪৩২ কেজির বেশি। প্রতি কেজি সোনার দাম গড়ে ২ কোটি টাকা হিসেবে হিসাব করলে এসব সোনার আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে, অর্থাৎ জুলাই পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ৫৩ দশমিক ৭২৭ কেজি সোনা উদ্ধার হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ২০২২–২৩ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে উদ্ধার করা সোনার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৩ হাজার ২১ কেজি।
সন্দেহভাজন যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি ছাড়াও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উড়োজাহাজে অভিযান চালিয়ে এসব সোনা উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, এবারের ঘটনাটি ব্যতিক্রম। এর আগে বিমানবন্দরে সোনার বার, বিস্কুট এবং পোশাকের মধ্যে লুকানো সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।
নতুন নতুন পদ্ধতিতে চোরাচালানের চেষ্টা হলেও বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

