রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বৃহস্পতিবার ইউনিটটির চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে এটিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ নামে পরিচিত।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বায়রার চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করতে অনুমোদন দেওয়া হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে আরও দুটি অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভালভে ত্রুটি থাকায় এতদিন পরবর্তী ধাপের অনুমোদন আটকে ছিল। চুল্লির চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমানোর কাজে ব্যবহৃত ওই ভালভের সমস্যা সমাধানে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আনা হয়। তাদের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় মেরামত ও পরীক্ষা শেষে ভালভটি একাধিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়। এরপরই চুল্লি চালুর পরবর্তী ধাপে যাওয়ার পথ খুলে যায়।
কম শক্তিতে শুরু হবে পারমাণবিক বিক্রিয়া
অনুমোদনের পর প্রথম ধাপে চুল্লিতে খুব কম শক্তিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করা হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাষায় এই ধাপই ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’।
এই পর্যায়ে চুল্লির বিভিন্ন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই পরীক্ষা ও প্রস্তুতির পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
পরীক্ষাগুলো সন্তোষজনক হলে ধীরে ধীরে চুল্লির ক্ষমতা বাড়ানো হবে। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কেন্দ্রের অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালুর প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ধাপে ধাপে বাড়বে উৎপাদন
পরবর্তী পর্যায়ে চুল্লির শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি টারবাইন চালু করা হবে। এরপর জেনারেটরের সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের সংযোগ স্থাপন করে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এ জন্য কেন্দ্র পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়রার কাছ থেকে আরও একটি পরিচালন অনুমোদন নিতে হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষমতায় পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
সব ধরনের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পূর্ণ উৎপাদনের আগে চলবে পরীক্ষা
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও প্রথম ইউনিট সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণমাত্রার উৎপাদনে যাবে না। বরং নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার বিভিন্ন দিক যাচাই করতে আরও সাত থেকে আট মাস পরীক্ষামূলকভাবে কেন্দ্রটি পরিচালনা করা হতে পারে।
সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সন্তোষজনকভাবে শেষ হওয়ার পর প্রথম ইউনিট পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন একটি উৎস যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশের সক্ষমতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি হবে।

