বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক বিষয়কে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে পৃথকভাবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াতে কূটনীতিকে আরও অর্থনীতিকেন্দ্রিক করা প্রয়োজন।
সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অগ্রগতি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই কৌশলগত ও তীব্র হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় শুধু পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হতে হবে জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা ও সম্প্রসারণ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুবিধা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যক্রমকে আরও বাণিজ্য ও বিনিয়োগমুখী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব মিশনকে নতুন বাজার খুঁজে বের করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাংলাদেশি পণ্যের প্রচার এবং দেশের মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বঙ্গোপসাগর প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলকে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চারটি মৌলিক দিক তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ হবে নীতিনির্ধারণের পথপ্রদর্শক, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হবে দেশের শক্তি, অংশীদারত্ব সৃষ্টি করবে নতুন সম্ভাবনা এবং শান্তি থাকবে চূড়ান্ত লক্ষ্য।
সিজিএস আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ জন বক্তা এবং ৩০০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি। সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, গবেষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উদ্ভাবক ও তরুণ নেতৃত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। সোমবার সম্মেলনের তিন দিনব্যাপী আয়োজন শেষ হয়।




