যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে ১২টি বি-১বি ল্যান্সার বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপে মার্কিন ভারী বোমারু বিমানের সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। রবিবার বিমানগুলো ঘাঁটি ছাড়ে।
লন্ডনের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ফেয়ারফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ইউরোপে ভারী বোমারু বিমান পরিচালনার প্রধান ঘাঁটি এবং বিদেশে মোতায়েন করা এসব বিমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রবর্তী অবস্থান।
তবে ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান প্রত্যাহার করলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েনের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী মিত্রদেশগুলোর বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকেই দীর্ঘপাল্লার অভিযান চালাতে পারে মার্কিন বিমানবাহিনী।
ফেয়ারফোর্ড ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে সন্ত্রাসবাদের সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে ব্রিটিশ পুলিশ। সর্বশেষ মঙ্গলবার আরও একজনকে আটক করা হয়।
এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর ঘাঁটির কাছে বিস্ফোরক স্থাপনের পরিকল্পনার সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। তাদের ব্যবহৃত ভ্যানে পেট্রল পাওয়া গেলেও কোনো বিস্ফোরক ডিভাইস উদ্ধার হয়নি। তবে তদন্ত এখনো চলছে।
পরে লন্ডন থেকে ২৫ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককেও বিমানঘাঁটিতে হামলার ষড়যন্ত্রের সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়। তাকেও পরে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ফেয়ারফোর্ড থেকে বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার পেছনে কিছু নিরাপত্তা হুমকি ছিল এবং এর সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘটনাকে নিয়মিত সামরিক রোটেশনের অংশ হিসেবেই দেখেছেন।
ইরানও বিমানঘাঁটিতে হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বোমারু বিমানগুলো
বর্তমানে মার্কিন বিমানবাহিনীর কৌশলগত বোমারু বহরে তিনটি প্রধান মডেল রয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের বি-২১ রাইডার ধীরে ধীরে বহরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বি-৫২ স্ট্রাটোফোরট্রেস:
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কৌশলগত বিমানশক্তির অন্যতম প্রতীক বি-৫২। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে নির্মিত বি-৫২এইচ মডেল এখনো সক্রিয় রয়েছে। প্রায় ৫৬ মিটার ডানার বিস্তৃতির এই বিমান প্রায় ৩১ টন অস্ত্র বহন করতে পারে। প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি এটি পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম।
বি-১বি ল্যান্সার:
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি মার্কিন বিমানবাহিনীতে যুক্ত হওয়া বি-১বি তিন ধরনের সক্রিয় বোমারুর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগামী। এটি শব্দের গতির প্রায় ১ দশমিক ২ গুণ গতিতে উড়তে পারে এবং প্রায় ৩৪ টন প্রচলিত অস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহন করে না।
ফেয়ারফোর্ড থেকে ফিরে যাওয়া ১২টি বিমানই ছিল এই বি-১বি ল্যান্সার।
বি-২ স্পিরিট:
স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে রাডারে শনাক্ত করা কঠিন বি-২ স্পিরিট মূলত শত্রুর শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে হামলা চালানোর জন্য তৈরি। এ ধরনের ২০টি বিমান নির্মিত হলেও বর্তমানে ১৯টি সক্রিয় রয়েছে। প্রচলিত ও পারমাণবিক—দুই ধরনের অস্ত্রই বহন করতে পারে এই বোমারু বিমান।
বি-২১ রাইডার:
মার্কিন বোমারু বহরের ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বি-২১ রাইডার। বি-২-এর তুলনায় ছোট এই স্টেলথ বোমারু বিমান বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালে দক্ষিণ ডাকোটার এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটিতে প্রথম বি-২১ মোতায়েন হওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্রে কোথায় থাকে বোমারু বিমান?
মার্কিন বোমারু বিমানের স্থায়ী ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডেই অবস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
বি-৫২এইচ—বার্কসডেল বিমানঘাঁটি, লুইজিয়ানা এবং মিনট বিমানঘাঁটি, নর্থ ডাকোটা।
-
বি-১বি—ডাইস বিমানঘাঁটি, টেক্সাস এবং এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটি, সাউথ ডাকোটা।
-
বি-২—হোয়াইটম্যান বিমানঘাঁটি, মিসৌরি।
-
বি-২১—প্রাথমিকভাবে এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটিতে মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব ঘাঁটির রানওয়ে বড় আকারের বোমারু বিমান ওঠানামার উপযোগী করে তৈরি। তবে শুধু দীর্ঘ রানওয়েই যথেষ্ট নয়। অস্ত্র সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোও এসব ঘাঁটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের বাইরে কোথায় মোতায়েন হয় মার্কিন বোমারু বিমান?
স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্থান করলেও প্রয়োজনের সময় বিশ্বের বিভিন্ন মিত্রদেশের ঘাঁটিতে সাময়িকভাবে বোমারু বিমান পাঠায় মার্কিন বিমানবাহিনী। এই ব্যবস্থাকে ‘বোম্বার টাস্ক ফোর্স’ মোতায়েন বলা হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়ামে অ্যান্ডারসেন বিমানঘাঁটি এবং ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া এ ধরনের মোতায়েনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া স্পেনের মোরন, নরওয়ের অরল্যান্ড এবং জাপানের মিসাওয়া ঘাঁটিতেও বিভিন্ন সময়ে মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার টিন্ডাল বিমানঘাঁটিতেও বি-৫২ পাঠানো হয়েছে।
এসব মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হলো মিত্রদের সঙ্গে যৌথ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য সংঘাতপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি থেকে দ্রুত অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি রাখা।
ঘাঁটি ছাড়াই দীর্ঘপাল্লার অভিযান সম্ভব
মার্কিন বোমারু বিমানশক্তির সবচেয়ে বড় সক্ষমতার একটি হলো দীর্ঘপাল্লার অভিযান চালানোর ক্ষমতা। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি ঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে বিমান রাখা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব।
আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমানের সহায়তায় বোমারু বিমানগুলো হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে উড্ডয়ন করে দীর্ঘ সময়ের মিশন পরিচালনার নজিরও দেখা গেছে।
কোনো কোনো অভিযানে বোমারু বিমানগুলোকে আকাশপথে একাধিকবার জ্বালানি নিতে হয়েছে। একটি মিশনে তিনটি বোমারু বিমানের জন্য ছয় থেকে নয়টি ট্যাংকার বিমানের প্রয়োজন হওয়ার কথাও জানা গেছে।
ফেয়ারফোর্ড ছাড়লেও সক্ষমতা থাকছে
ফেয়ারফোর্ড থেকে বি-১বি বিমান প্রত্যাহারের অর্থ ইউরোপে মার্কিন দূরপাল্লার বোমারু সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারে। পাশাপাশি নিজ ভূখণ্ড থেকেও দীর্ঘপাল্লার অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনীর।
অর্থাৎ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন বোমারু বিমানের উপস্থিতি শুধু স্থায়ী ঘাঁটির ওপর নির্ভরশীল নয়। দীর্ঘপাল্লার উড্ডয়ন, আকাশে জ্বালানি নেওয়ার সক্ষমতা, উন্নত বোমারু প্রযুক্তি এবং মিত্রদেশগুলোর সামরিক অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ—এই সমন্বয়ই যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের দূরবর্তী অঞ্চলেও দ্রুত বিমানশক্তি মোতায়েনের সক্ষমতা দিয়েছে।

