চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি সম্পন্ন করার আশা করছে বাংলাদেশ। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির আদলে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ পুনর্বহাল করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
একই সঙ্গে আগামী বছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হওয়ার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন তিনি। আর তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে ২০২৭ সালের মধ্যে এর মূল কাজ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
মার্চে পদ্মা ব্যারাজের কাজ দৃশ্যমানের আশা
পদ্মা ব্যারাজকে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মেগা প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, এর সুফল দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে একনেকের অনুমোদন পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজের কাজ দৃশ্যমান করার বিষয়ে সরকার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চ—এই তিন মাসের যেকোনো এক সময়ে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের স্টাডি সম্পন্ন করতেই ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়নের দিকে এগোয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ হাতে নিয়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তুতি
তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পকে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তাঁর ভাষ্য, তিস্তা একটি খরস্রোতা নদী এবং উজান থেকে আসা পানির প্রবাহের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠী নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের মূল কাজ শুরুর আগে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন। খুব শিগগিরই এই স্টাডির কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে ওই বছরই মূল প্রকল্পের কাজ শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে।
গঙ্গা চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফেরানোর লক্ষ্য
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি প্রসঙ্গে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ৩০ বছর মেয়াদি বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হবে। এর আগে নতুন চুক্তি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৭৭ সালে প্রথম গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে চুক্তি নবায়নের সময় সেই ধারা রাখা হয়নি। এবার নতুন চুক্তিতে ওই গ্যারান্টি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকেই বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্থাৎ ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে বাংলাদেশ আশাবাদী। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
‘বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থই সবচেয়ে বড় চাপ’
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক কোনো চাপ বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, নদী তীরবর্তী মানুষের স্বার্থই সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, পদ্মা ও তিস্তা অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক। তাদের জীবন, জীবিকা ও স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, তিস্তার মতো বড় প্রকল্পের কারিগরি ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব নয়। অতীতে পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়নি। এবার সরকার নিজস্ব উদ্যোগে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে চায়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা ইস্যুতেই দৃশ্যমান অগ্রগতি আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে।

