গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বেসামরিক প্রাণহানি এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়লেও তেল আবিবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করছে ভারত। পশ্চিমা কয়েকটি দেশ যখন ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে, তখন নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতকে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন অবস্থানে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে ভারতের এই পরিবর্তন এবং এর পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
পশ্চিমাদের চাপ, দিল্লির ভিন্ন অবস্থান
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ ইসরায়েলের কয়েকজন কট্টরপন্থি রাজনীতিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ভারত তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখছে।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের ভারত সফরের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত এই ইসরায়েলি রাজনীতিক ভারতে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন এবং তাঁর সফরকালে বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত একাধিক সমঝোতা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পরোয়ানা এবং ইসরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও মোদীর ইসরায়েল সফর দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। ওই সফরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মোদীকে ‘বন্ধু’র পাশাপাশি ‘ভাই’ হিসেবেও অভিহিত করেন।
ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান থেকে নতুন বাস্তবতা
ভারতের ইসরায়েল নীতির বর্তমান অবস্থান দেশটির ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করেছে।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল ভারত। পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনের প্রতি দিল্লির সমর্থন ছিল স্পষ্ট। এমনকি আরব বিশ্বের বাইরের দেশগুলোর মধ্যে ভারতই প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি, যারা ফিলিস্তিন মুক্তিসংস্থা বা পিএলওকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
তবে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে শুরু করে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা প্রকাশ্য ও বিস্তৃত হয়েছে।
গাজা ইস্যুতে দিল্লির ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান
ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনের জন্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে আসছে। তবে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দিল্লির প্রকাশ্য সমালোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত—এমন দাবি উঠে এসেছে বিশ্লেষণটিতে।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাতে ভারত ও ইসরায়েলের সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল থেকে অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ভারত অন্যতম বড় ক্রেতা। পাশাপাশি যুদ্ধ চলাকালীন ভারত থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির তথ্যও আলোচনায় এসেছে।
হিন্দুত্বের রাজনীতি কতটা প্রভাব ফেলছে?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতাকে শুধু কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শেরও সম্পর্ক রয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর মোদীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং হামলাটিকে ভারতের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টিও এই অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষক রশীদ কিদওয়াইয়ের মতে, ভারতে ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে ইসরায়েলের কঠোর নিরাপত্তা নীতির প্রতি সহানুভূতির একটি যোগসূত্র রয়েছে। ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক বয়ানের কিছু ক্ষেত্রে মিলও তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আড়ালের সম্পর্ক এখন প্রকাশ্যে
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা নতুন নয়। তবে আগে যে সম্পর্কের অনেকটাই কূটনৈতিক গোপনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, মোদী সরকারের সময়ে তা প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে।
গাজা যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ব যখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে আরও গভীরভাবে বিভক্ত, তখন দিল্লির অবস্থানও সেই বৈশ্বিক মেরুকরণে একটি স্বতন্ত্র দিক নির্দেশ করছে। ফিলিস্তিনের পক্ষে ঐতিহাসিকভাবে দৃশ্যমান অবস্থান থেকে সরে এসে ভারত এখন ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে—যা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন মাত্রা যোগ করছে।

