বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা এ দাবি জানান। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে আবরারের নামে সেতু ও বুয়েটে হল নির্মাণসহ আরও কয়েকটি দাবিও তুলে ধরা হয়।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যদের এ সাক্ষাৎ হয়।
সাক্ষাতে আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ, মা রোকেয়া খাতুন, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ, এক মামা ও এক চাচা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
আবরারের বাবা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার ছেলের হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকরের বিষয়ে সহযোগিতা চান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আদালত স্বাধীনভাবে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তবে পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
সাক্ষাতে কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবিও জানান আবরারের বাবা। তিনি জানান, ওই এলাকার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ বর্তমানে সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সেতু নির্মাণের বিষয়ে আশ্বাস দেন এবং সেতুটির নাম আবরার ফাহাদের নামে করার প্রতিশ্রুতি দেন।
এ ছাড়া আবরারের কবর পাকাকরণ এবং কবরের পাশের মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য সহযোগিতা চান তার বাবা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মসজিদটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেন।
আবরার হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন তার বাবা। তিনি জানান, মামলার এক আসামি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
সাক্ষাতে আবরারের মা রোকেয়া খাতুন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোনো মায়ের সন্তান যেন আর এভাবে নিহত না হয় এবং কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন আগের মতো সহিংস পরিবেশ ফিরে না আসে।
আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বুয়েট ক্যাম্পাস পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান। পাশাপাশি বুয়েটে আবরার ফাহাদের নামে একটি হল নির্মাণের দাবি করেন। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা সচিবের সঙ্গে কথা বলেন।
নতুন প্রজন্মকে আবরার ফাহাদ সম্পর্কে জানাতে পাঠ্যবইয়ে তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানান ফাইয়াজ। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের তালিকার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে নিহত ব্যক্তিদেরও একটি তালিকা তৈরির দাবি করেন তিনি।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে একটি প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।
সাক্ষাতের সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরও উপস্থিত ছিলেন।
যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল আবরারকে
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন তার বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।
মামলার রায়ে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ওই রায় বহাল রাখেন।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা নয় আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেছেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিও লিভ টু আপিল করেছেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
আবরার ফাহাদের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে। হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।

