মো. মোক্তার হোসেন বাবু:
কর্ণফুলীর কাদামাটি, বাঁশ, খড় আর শিল্পীর নিপুণ হাত। একের পর এক মাটির কাঠামোয় ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার অবয়ব। কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ, কোথাও রং-তুলির শেষ আঁচড়। আবার কোনো মণ্ডপে চলছে আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজ। দিন-রাতের হিসাব ভুলে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত চট্টগ্রামের প্রতিমা শিল্পী ও পূজা আয়োজকেরা।
শহরের সিআরবির সাত রাস্তার মোড়ের শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ নিতাইগৌর বন্ধুকুঞ্জ আশ্রম, সদরঘাট কালীবাড়ী, ঘোষ বাড়ি, হাজারী লেইন, দেওয়ানজী পুকুরপাড়, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। প্রতিমা শিল্পীদের পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতিতেও চলছে শেষ মুহূর্তের তোড়জোড়।
শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ নিতাইগৌর বন্ধুকুঞ্জ আশ্রমে এবার অর্ধশতাধিক দুর্গা প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। ৮৬ বছর বয়সী প্রতিমা শিল্পী তুলসী রঞ্জন পাল দীর্ঘদিন ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। খুলনার বাগেরহাট থেকে আসা এই শিল্পী জানান, বাবার কাছ থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ শিখেছেন তিনি। প্রায় দুই দশক ধরে চট্টগ্রামে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন।
তুলসী রঞ্জন পাল বলেন, বাসন্তী পূজার পর থেকেই এবার দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ১০ থেকে ১২ জন কারিগর দিন-রাত কাজ করছেন। প্রতিমার বায়না নেওয়া থেকে শুরু করে নির্ধারিত সময়ে তা বুঝিয়ে দেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তার। এতগুলো প্রতিমা সময়মতো শেষ করতে পারবেন কি না, তা নিয়েই তার ব্যস্ততা ও দুশ্চিন্তা।
এই প্রবীণ শিল্পীর হাতে তৈরি হয় মাটির শাড়ি, গয়না ও অলংকারসহ নানা ধরনের প্রতিমা। তবে সময়সাপেক্ষ এই ঐতিহ্যবাহী কাজের কদর আগের তুলনায় কমছে বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, এখন অনেকেই বাজার থেকে কেনা শাড়ি ও গয়না দিয়ে প্রতিমা সাজাতে বেশি আগ্রহী। ফলে মাটি দিয়ে শাড়ি-অলংকার তৈরির ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
আরেকটি বিষয় তাকে ভাবিয়ে তুলছে-নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ। তার ছেলে-মেয়েরা কিংবা তরুণ প্রজন্মের অনেকেই প্রতিমা তৈরির পেশায় আসতে চান না। চাকরি ও অন্যান্য পেশার দিকে তাদের আগ্রহ বেশি। এতে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্প ও ঐতিহ্য ভবিষ্যতে কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তার।
বদলে যাচ্ছে প্রতিমা তৈরির কৌশল
সময় বদলের সঙ্গে প্রতিমা তৈরির কাজেও এসেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। প্রতিমার চোখে রং-তুলির শেষ আঁচড় দিতে ব্যস্ত শিল্পী শুভ পাল জানান, আগে প্রতিমা তৈরির পর রোদে শুকানোর ওপরই বেশি নির্ভর করতে হতো। এখন বৈরী আবহাওয়ার কারণে গ্যাসের তাপ ব্যবহার করে দ্রুত মাটি শুকানো হচ্ছে।
প্রতিমার মুখের অবয়ব তৈরিতেও এসেছে নতুন পদ্ধতি। ডাইস ব্যবহার করে মুখের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও নিখুঁত কাজের ক্ষেত্রে দক্ষ শিল্পীর হাতের গুরুত্ব এখনো আগের মতোই রয়েছে বলে জানান তিনি।
বেড়েছে উপকরণের দাম
প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িত শিল্পীদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি। বাঁশ, কাঠ, খড়, মাটি, রং, কাপড় ও সাজসজ্জার সামগ্রী—প্রায় সবকিছুর দামই বেড়েছে।
শরীয়তপুরের মঙ্গল পাল ৬০ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশায় থাকা এই শিল্পী বলেন, উপকরণের দাম বাড়ায় প্রতিমা তৈরির খরচও বেড়েছে। আগে যে মাটি ১০ হাজার টাকায় কেনা যেত, এখন সেটির জন্য প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।
তার মতে, উপকরণের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রতিমার মূল্য বাড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে শিল্পীদের শ্রম ও আয়—দুই দিকেই চাপ তৈরি হচ্ছে।
শাস্ত্রীয় রীতি মানার নির্দেশনা
প্রতিমা নির্মাণে শাস্ত্রীয় রীতি ও প্রচলিত শিল্পরীতি অনুসরণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। নিতাইগৌর বন্ধুকুঞ্জ আশ্রমে টাঙানো বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেবী দুর্গা, মহিষাসুর, অসুরসহ অন্যান্য দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরিতে শাস্ত্রীয় কাঠামো ও প্রচলিত শিল্পরীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
প্রতিমার চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মণ্ডপ কমিটি ও থানা পূজা উদযাপন পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এমন কোনো উপাদান বা অবয়ব প্রতিমায় ব্যবহার না করার নির্দেশনা রয়েছে, যা কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে।
মণ্ডপে মণ্ডপে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
হাজারী লেইনসহ নগরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানোর কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোথাও বাঁশ ও কাপড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক কাঠামো, কোথাও চলছে আলোকসজ্জার কাজ। আয়োজকদের ব্যস্ততায় মণ্ডপ এলাকায় এখন উৎসবের আবহ।
হাজারী লেইনের একটি মণ্ডপের দায়িত্বশীল এক কর্মী জানান, তাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এবারের আয়োজনে বিশেষ একটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সেটি এখনই প্রকাশ করতে চান না তারা। আরও কিছুদিন পর তা দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হবে।
সব মিলিয়ে দুর্গোৎসবকে ঘিরে চট্টগ্রাম নগরে এখন সাজ সাজ রব। প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কর্ণফুলীর মাটি যেমন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবী দুর্গায়, তেমনি নগরের পূজামণ্ডপগুলোও প্রস্তুত হচ্ছে পাঁচ দিনের উৎসবের জন্য।
আগামী ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর আবাহন হবে। এরপর ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এই উৎসব।




