এআইকে সঙ্গী করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ঝুঁকি সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের শক্তিশালী চাহিদা এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক নানা অভিঘাত সামলে এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে প্রচলিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতার দিকে ঝুঁকতে হবে।

- Advertisement -

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আপডেট’ প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও উন্নত অর্থনীতির তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখনো অনেক পিছিয়ে। তবে এই পিছিয়ে থাকা শুধু দুর্বলতা নয়, বরং দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার একটি বড় সুযোগও তৈরি করেছে।

অভ্যন্তরীণ বাজারে ভর করে স্থিতিশীলতা

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম বড় ভিত্তি এখনো অভ্যন্তরীণ চাহিদা। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নানা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও ভোক্তা ব্যয় এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে এই স্থিতিশীলতার সামনে বেশ কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও আমদানি—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়তে পারে। পাশাপাশি জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে শক্তিশালী এল নিনোর মতো পরিস্থিতি দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন। প্রয়োজন উৎপাদনশীলতার নতুন উৎস।

সেখানেই এআইয়ের সম্ভাবনা

এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে এআইকে কেবল প্রযুক্তি খাতের উদ্ভাবন হিসেবে দেখা হয়নি; বরং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান তৈরির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় এআই ব্যবহারের হার এখনো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কম। ফলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকার ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ‘লিপফ্রগ’ বা দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে ফেলার সুযোগ। যথাযথ নীতি ও বিনিয়োগ করা গেলে অপেক্ষাকৃত কম উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো থেকেও নতুন প্রজন্মের এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করে উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তবে শুধু প্রযুক্তি আমদানি করলেই এআইয়ের সুফল পাওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ কর্মী, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর নীতিমালা।

মানবসম্পদে বিনিয়োগ জরুরি

এআইয়ের বিস্তার কর্মবাজারেও পরিবর্তন আনবে। কিছু প্রচলিত কাজের চাহিদা কমতে পারে, আবার প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের খাপ খাওয়াতে না পারলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল নাও আনতে পারে।

এ কারণে দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ ও পুনঃদক্ষতাকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীকে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু কম্পিউটার ও ডেটার ওপর নয়, মানুষের দক্ষতার ওপরও।

বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ব্যবসাও

এআইয়ের সুফল যেন শুধু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এআই ব্যবহার করতে পারলে উৎপাদন, বিপণন, হিসাব ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকসেবায় দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ, দক্ষ জনবলের অভাব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। এসব প্রতিবন্ধকতা কমাতে নীতি সহায়তা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবন উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

দরকার আস্থার পরিবেশ

এআইয়ের প্রসারের সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

সঠিক নীতিমালা থাকলে একদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে এআই ব্যবহারের ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন উদ্ভাবনের গতি কমাতে পারে, তেমনি পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে তথ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকার নিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের এই বার্তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা ধরে রাখতে হলে শুধু প্রচলিত শিল্প ও সেবার ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতার দিকে এগোতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো—ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ানো এবং ব্যবসার পরিবেশ আরও কার্যকর করা। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এআই ব্যবহারে সক্ষম করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে সুযোগ, সঙ্গে চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি মূল্য এবং জলবায়ু ঝুঁকি প্রবৃদ্ধির পথে বাধা তৈরি করছে। অন্যদিকে এআইয়ের দ্রুত বিকাশ নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো—এআইকে শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। এটি ইতোমধ্যে উৎপাদনশীলতা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি এখন থেকেই দক্ষতা, অবকাঠামো ও নীতিগত প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তাহলে প্রযুক্তিগত ব্যবধান তাদের দুর্বলতা হয়ে থাকবে না। বরং এআইকে কাজে লাগিয়েই অঞ্চলটি প্রবৃদ্ধির একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।

সর্বশেষ