চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইজারার বিরুদ্ধে একজোট শ্রমিক সংগঠন

মো.মোক্তার হোসেন বাবু:
spot_img

মো.মোক্তার হোসেন বাবু: জাতীয় রাজনীতিতে বড় দলগুলোর অবস্থান যেখানে পরস্পরবিরোধী, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার বিরোধিতায় এক কাতারে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শ্রমিক সংগঠন।

- Advertisement -

বিএনপি সমর্থিত চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, বামপন্থি শ্রমিক সংগঠন, জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘসহ বিভিন্ন সংগঠন একই দাবিতে মাঠে রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থিত বন্দর জাতীয় শ্রমিক লীগের কিছু নেতাকর্মীকেও ভিন্ন কৌশলে এই আন্দোলনের কর্মসূচিতে যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিন্ন বক্তব্য, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে মিছিল, সভা ও সমাবেশ হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি হলে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর কর্মসূচিও আসতে পারে।

বিএনপির সমর্থিত সংগঠনেই দ্বিমত

চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল বিদেশি অপারেটরবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকলেও সংগঠনটির অবস্থান নিয়ে বিএনপির ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। সংগঠনটির অনেক নেতাই অতীতে ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তবে শ্রমিক দলের নেতারা বলছেন, তারা দলীয় ব্যানারে নয়, ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে আন্দোলন করছেন। তাই এটিকে বিএনপি সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তাদের দাবি।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, তারা বিএনপি সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলেও বন্দরের স্বার্থে সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন করছেন। দলের চেয়ে দেশের ও বন্দরের স্বার্থকে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, বন্দরের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

একই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সচিব শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, তারা ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চান না। তার ভাষ্য, শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নিষেধ করা হলেও বন্দরের স্বার্থে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ও বন্দর শ্রমিক দল নেতা ইব্রাহিম খোকনও একই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, এনসিটি-সিসিটির পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে দেশের ক্ষতি হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প না থাকায় বন্দরের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তিকে সমর্থন করা সম্ভব নয়।

তবে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের একটি অংশ এই আন্দোলনে নেই। সংগঠনটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দলীয় শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আন্দোলন করা ঠিক হবে না। তাদের মতে, বিদেশি অপারেটরবিরোধী অবস্থান নেওয়া কার্যত সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা।

বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব, বন্দরে অভিন্ন অবস্থান

জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ইস্যুতে দুই পক্ষের সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের অবস্থান একই।

জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ ইতোমধ্যে এনসিটি-সিসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিরোধিতায় মিছিল, সভা ও সমাবেশ করেছে।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, বিদেশি অপারেটরের হাতে এনসিটি-সিসিটির পরিচালনা না দেওয়ার দাবিতে তারাও আন্দোলনে রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত নিজেদের সংগঠনের ব্যানারেই কর্মসূচি পালন করছেন তারা।

তিনি বলেন, চুক্তি হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করতে সংবাদ সম্মেলন করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বন্দর কার্যক্রম বন্ধের যে ঘোষণা দিয়েছে, তাদের সংগঠন এখনো সে ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

বামপন্থিদের সঙ্গেও একই মঞ্চ

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) চট্টগ্রাম সভাপতি তপন দত্ত শুরু থেকেই টার্মিনাল ইজারার বিরোধিতায় মাঠে রয়েছেন।

রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকা সংগঠনগুলো কীভাবে একই দাবিতে এক হলো—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থের জায়গায় তাদের মধ্যে ঐক্য রয়েছে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন একসঙ্গে আন্দোলন করছে। এমনকি বন্দর জাতীয় শ্রমিক লীগের অনেক নেতাকর্মীকেও কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে বলে তিনি জানান।

এনসিটি ইজারার প্রক্রিয়া

গত ১ অক্টোবর এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক কোনো অপারেটরের কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই দিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এনসিটি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের সঙ্গে খসড়া চুক্তি অনুমোদনের কথা জানানো হয়। তবে বিজ্ঞপ্তিতে অপারেটরের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

তবে বন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা রয়েছে।

এর আগে গত জুনের প্রথম সপ্তাহে এনসিটি ইজারা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারও এর আগে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি। এরপর থেকেই বিদেশি অপারেটরবিরোধী আন্দোলন জোরালো হয়েছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এনসিটি-সিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের দেওয়া হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। চুক্তি হলে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ