কুমিল্লার চাঞ্চল্যকর তাজমিন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার একজন

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মৃত্যুর ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

- Advertisement -

এদিকে তাজমিনকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তবে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তি সুমন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় চালকের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্ত চলছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। তিনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বাগমারা দক্ষিণ ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। প্রায় এক মাস আগে বসতঘর বিক্রি করে সেখান থেকে চলে যান তিনি। সূত্রের দাবি, সুমন মাদকাসক্ত ছিলেন।

চালককে শনাক্ত করার পর থেকেই তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমনের বোন, বোনের স্বামী ও খালাশাশুড়িকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী অভিযান চালানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুমন নামে এক ব্যক্তির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

ধানক্ষেতে মিলল স্কুলছাত্রীর মরদেহ

বৃহস্পতিবার ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের কাছেই পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

গাড়িটির মালিক চালক হিসেবে সুমনকে শনাক্ত করেছেন বলে জানা গেছে। অটোরিকশাটির নিবন্ধনও রয়েছে। তবে তাজমিনের মৃত্যুর সঙ্গে চালকের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত কোনো তথ্য জানায়নি পুলিশ।

সিসিটিভিতে দেখা গেল শেষ রাতের চলাচল

তদন্তের অংশ হিসেবে তাজমিনের মৃত্যুর আগের রাতের কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এসব ফুটেজে বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে তাকে নামতে দেখা যায়।

এরপর হোটেলসংলগ্ন একটি খাবারের দোকান এবং পশ্চিম পাশের কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যেতে দেখা যায় তাজমিনকে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথাও বলেন তিনি। এ সময় দোকানিকে তাকে কিছু দেখাতে কিংবা কোনো বিষয়ে নির্দেশনা দিতে দেখা যায়।

ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু দেখার পর সেখান থেকে সরে অন্য পাশে চলে যান তাজমিন। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে হোটেল এলাকা ত্যাগ করেন তিনি। এরপর বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন।

তবে এরপর কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তিনি লালমাইয়ের জগতপুরের ধানক্ষেতে পৌঁছালেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করছেন তদন্তকারীরা।

বাবাকে পাঠিয়েছিলেন লাইভ লোকেশন

নিহত তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ধানমন্ডি পাড়ায় তাঁদের ভাড়া বাসা থেকে বের হন তাঁর একমাত্র মেয়ে। শহরে এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হলেও পরে ওই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যান তাজমিন। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বারবার ফোন করেও সাড়া পাননি আবদুল আলীম। এতে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

আবদুল আলীমের ভাষ্য, বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে তাজমিন তাঁর মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি লাইভ লোকেশন শেয়ার করেন। বার্তায় তাঁকে গিয়ে নিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন মেয়ে।

আবদুল আলীম বলেন, “তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে এসে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।”

মেয়ের পাঠানো লোকেশন ধরে সেখানে গিয়ে মরদেহ উদ্ধারের দৃশ্য দেখার কথা জানিয়েছেন তিনি।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তাজমিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধারের পর প্রথমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও পরে তা নিশ্চিত করা হয়।

ওসি বলেন, কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা জানতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

তিনি আরও জানান, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না এবং তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তির পরিচয়, সিএনজি চালকের ভূমিকা এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ—সবকিছুই এখন তদন্তের অপেক্ষায়। পুলিশ বলছে, তদন্তের অগ্রগতির মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে।

সর্বশেষ