কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে আলোচনায় থাকা বাগেরহাটের রামপাল এবার নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় প্রকল্পের জন্যও সামনে আসছে। সুন্দরবনের কাছাকাছি এলাকায় ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
‘রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’ নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)। বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
ব্যয় আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।
এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৫ কোটি ৩৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২ হাজার ১২৭ কোটি ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা আসবে ‘বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল’ থেকে।
চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকাতেও রয়েছে এটি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ব্যবহৃত হবে অব্যবহৃত জমি
রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১২ সালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। জমিটি ‘ব্লক এ’ ও ‘ব্লক বি’—এই দুই অংশে বিভক্ত।
‘ব্লক এ’-তে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘ব্লক বি’ রয়েছে বিউবোর ব্যবস্থাপনায়।
এই অংশে বিউবোর মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ৯১৮ দশমিক ৫০ একর। তবে এর পুরোটা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ব্যবহার করা হবে না। গ্রিন বেল্ট, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ, নিম্নভূমি ও লেক হিসেবে ব্যবহৃত জমি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৬৮৫ একর জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শুধু সোলার প্যানেল নয়, তৈরি হবে অবকাঠামোও
প্রস্তাবিত প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক সোলার প্যানেল স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পের আওতায় ইনভার্টার স্টেশন ও পুলিং সাবস্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামোও তৈরি করা হবে।
ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রামপালে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সৌরশক্তি থেকেও বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একনেকে উঠছে আরও একাধিক প্রকল্প
রামপাল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি একনেকের সভায় আরও বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। নতুন ১০টি ও সংশোধিত একটি প্রকল্পসহ মোট ১২টি প্রকল্প রয়েছে তালিকায়।
এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডে সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়ন, রংপুর সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন জোনে রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও আটটি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ, ফ্রান্সের প্যারিসে কেনা চ্যানসারি ভবনের সংস্কার ও আধুনিকায়ন এবং পঞ্চগড়ে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণের প্রকল্পও অনুমোদনের তালিকায় রয়েছে।
অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নেও প্রকল্প
তালিকায় থানচি-রিমাকরি-মদন-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ চতুর্থবার বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির একটি প্রকল্প এবং সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও রয়েছে।
এর বাইরে জয়পুরহাট জেলার নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল ও খাড়োয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্পের বিষয়েও একনেককে অবহিত করার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, একদিকে রামপালে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ, অন্যদিকে নগর ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন—দুই ধরনের প্রকল্পই এবারের একনেকের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। রামপালের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর তালিকায় নতুন একটি সংযোজন হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অংশ বাড়ানোর পথও আরও প্রশস্ত হতে পারে।

