রোনালদোর বিস্ফোরক মন্তব্য, ‘আমার শাস্তি প্রাপ্য’

খেলা ডেস্ক
spot_img

পর্তুগাল জাতীয় দলের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এবার সরাসরি মুখ খুলেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, কোচের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে ভিন্ন আচরণই তাঁকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

- Advertisement -

রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে বিদায়ের পরিকল্পনা তাঁর আগে থেকেই ছিল। তবে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। এরপর জাতীয় দলের নতুন কোচ নির্বাচন নিয়েও তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়। রোনালদো জানান, বর্তমান কোচকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি তখন সমর্থন করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত।

নতুন কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর রোনালদোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। তাঁদের বৈঠকে কোচ তাঁকে নিজের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। রোনালদো জানান, তখন তাঁকে প্রথম ও শেষ ম্যাচ খেলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনায় মাঝের ম্যাচগুলোতে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।

তবে নরওয়ে ও ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের ক্ষেত্রে তাঁকে ভিন্নভাবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কোচ চেয়েছিলেন, রোনালদো প্রথম ম্যাচ খেলে পর্তুগালে থেকে যান এবং পরে দ্রাগাও স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় ম্যাচের আগে দলের সঙ্গে যোগ দেন। রোনালদো ওই প্রস্তাবে রাজি হননি। তাঁর মতে, বিদেশের মাঠের ম্যাচে দলের সঙ্গে না থাকা একজন অধিনায়কের জন্য ভালো দৃষ্টান্ত হতো না।

৩০ মিনিট খেলার কথা, শেষ পর্যন্ত শুধু ওয়ার্ম-আপ

নরওয়ের ম্যাচের দিন দুপুরে কোচের সহকারী রোনালদোর কাছে এসে তাঁকে কোচের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে কোচ তাঁকে জানান, তিনি ৩০ মিনিট খেলতে চান। রোনালদো বলেন, ওই সময় তিনি নিজের শারীরিক পুনরুদ্ধার ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছিলেন এবং ম্যাচে খেলার প্রত্যাশাও তাঁর ছিল না। তবু কোচের অনুরোধে তিনি রাজি হন।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে রোনালদো ওয়ার্ম-আপ শুরু করেন। কিন্তু সময় গড়ালেও তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি। তাঁর অভিযোগ, কোচের দেওয়া কথা শেষ পর্যন্ত রাখা হয়নি।

ম্যাচ শেষে হতাশ রোনালদো সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে যাননি। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় তিনি পর্তুগালের সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চান। তাঁর মতে, এটি ছিল হতাশার মুহূর্ত এবং এমন আচরণ তাঁর করা উচিত হয়নি।

বৈঠকে সমঝোতা হলেও বদলে যায় পরিস্থিতি

রোনালদো জানান, ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর তিনি কোচ ও আল নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমো কুতিনিওর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয় এবং পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে একটি সমঝোতাও হয়।

রোনালদোর দাবি, কোচ তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সংবাদ সম্মেলনে পুরো বিষয়টির সত্যতা পরিষ্কার করবেন। সেখানে বলা হবে, রোনালদো কয়েক মিনিটের জন্যও খেলতে অস্বীকৃতি জানাননি; বরং তাঁকে ওয়ার্ম-আপ করিয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠে না নামানো কোচের ভুল ছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকের পর কোচ তাঁকে আলিঙ্গন করে বিষয়টির সমাধান হয়েছে বলে জানান। রোনালদো ডেনমার্কের ম্যাচে খেলবেন না, তবে পরবর্তী ম্যাচে মাঠে নামবেন—এমন সিদ্ধান্তও হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তী একটি বৈঠকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায় বলে দাবি রোনালদোর। তাঁর ভাষায়, আগের দিনের ব্যক্তিগত আলোচনার সঙ্গে পরের বৈঠকের আচরণের কোনো মিল ছিল না। তিনি সেখানে আগ্রাসী ও নির্দেশমূলক মনোভাবের মুখোমুখি হন, যা তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে।

‘আমি শুধু সত্যিটা শুনতে চেয়েছিলাম’

রোনালদো জানান, জাতীয় দলের কোচের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ার পরও তিনি সরাসরি সত্য জানতে চেয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ফেডারেশনের সভাপতি ও কোচ যদি তাঁকে স্পষ্ট করে বলতেন যে তাঁরা তাঁকে দলে চান না, তাহলে তিনি বিষয়টি মেনে নিতেন।

তাঁর মতে, জাতীয় দলের হয়ে প্রায় ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে কোনো কোচের কারিগরি বা কৌশলগত সিদ্ধান্তে তিনি কখনো হস্তক্ষেপ করেননি। কোচদের সিদ্ধান্তকে তিনি সব সময় সম্মান করেছেন। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তা পালন না করা তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় বিষয়।

রোনালদো বলেন, তিনি যখন মনে করেছেন তাঁর উপস্থিতি দলের জন্য ইতিবাচক নয়, তখন জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের জন্য সতীর্থদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।

নিজের শাস্তিও মেনে নিতে প্রস্তুত রোনালদো

জাতীয় দলের ক্যাম্প ত্যাগের ঘটনায় নিজের দায় স্বীকার করেছেন রোনালদো। তিনি মনে করেন, দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর আচরণের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাই এ ঘটনায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন যে শাস্তি দেবে, তা মেনে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

রোনালদোর ভাষায়, নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। তিনি নিজেকে সাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে দেখেন না; জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর দায়িত্বও বেশি। তাই নিজের আচরণের পরিণতি তাঁকে গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিদায়ী ম্যাচ নয়, প্রতিযোগিতাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ

জাতীয় দল থেকে বিদায়ের জন্য বিশেষ ম্যাচ আয়োজনের আলোচনা নিয়েও নিজের অবস্থান জানিয়েছেন রোনালদো। তাঁর বক্তব্য, সমর্থকদের জন্য এক বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ হতে পারে। তবে জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো প্রতিযোগিতা ও জয়ের লড়াই।

তিনি বলেন, দেশের হয়ে খেলার দায়িত্বকে তিনি সব সময় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়েও জাতীয় দলের দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি।

সবশেষে রোনালদো স্পষ্ট করেছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর তিনি যদি শারীরিকভাবে ফিট থাকেন এবং ক্লাবের হয়ে খেলতে সক্ষম হন, তাহলে জাতীয় দলের ডাক পেলে আবারও পর্তুগালের হয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুত থাকবেন।

অর্থাৎ, বর্তমান ঘটনার মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটছে—এমনটা মনে করছেন না রোনালদো। বরং তাঁর বার্তা, শাস্তি মেনে নিয়েও সুযোগ পেলে তিনি আগের মতোই দেশের হয়ে লড়াই করতে এবং জিততে প্রস্তুত।

সর্বশেষ