মো.রাকিব,চট্টগাম: হাতে ফুল, সঙ্গে শুভেচ্ছা কার্ড। কারও হাতে চকলেট, কারও হাতে কলম কিংবা ছোট্ট কোনো উপহার। দামি কিছু নয়, কিন্তু প্রতিটি উপহারের সঙ্গে মিশে ছিল শিক্ষার্থীদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। শিক্ষক দিবসে এমনই এক আবেগঘন আয়োজনে শিক্ষকদের চমকে দিয়েছে চট্টগ্রামের পটিয়ার আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোচনা সভা, র্যালি কিংবা আনুষ্ঠানিক নানা কর্মসূচি থাকে। তবে এ বিদ্যালয়ে এবার আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শিক্ষকরা। কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের চেয়ে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভালোবাসার সম্পর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল থেকেই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ১৮টি শাখায় পৃথকভাবে আয়োজন করা হয় শিক্ষক দিবসের এ বিশেষ কর্মসূচি।
শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতেই শিক্ষার্থীরা ফুল দিয়ে তাঁদের বরণ করে নেয়। এরপর একে একে শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় শুভেচ্ছা কার্ড, চকলেট, কলমসহ বিভিন্ন উপহার। অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ছোট উপহার নিয়ে হাজির হয়। উপহার দেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল আনন্দ, আর শিক্ষকদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে আবেগ ও বিস্ময়।
দামের চেয়ে বড় হয়ে উঠল ভালোবাসা
শিক্ষার্থীদের দেওয়া উপহারগুলোর আর্থিক মূল্য হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু শিক্ষকরা বলছেন, উপহারের মূল্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আন্তরিকতাই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের হাতে ফুল ও উপহার দেখে অনেক শিক্ষক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকরা শুধু পাঠদানের মানুষ নন, তাঁদের জীবনের পথ দেখানো একজন অভিভাবকের মতো। সেই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা থেকেই শিক্ষক দিবসে নিজেদের মতো করে শিক্ষকদের সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেয় তারা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের অন্য এক দিক তুলে ধরেছে। যেখানে পরীক্ষার ফল, শ্রেণিকক্ষের পাঠ কিংবা নিয়মকানুনের বাইরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতাই হয়ে উঠেছে দিনের মূল বার্তা।
‘শিক্ষকতা মানুষ গড়ার দায়িত্ব’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ.টি.এম. তোহা বলেন, ‘শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার মহান দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও সম্মান একজন শিক্ষকের জন্য বড় প্রাপ্তি। তাদের এই আয়োজন আমাদের আনন্দিত করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফলের পাশাপাশি নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠুক। আজকের এই আয়োজন তাদের সেই মানবিক মূল্যবোধেরই একটি সুন্দর প্রকাশ।’
১৮ শ্রেণি শাখায় আলাদা আয়োজন
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ১৮টি শাখায় আলাদাভাবে শিক্ষক দিবসের কর্মসূচি পালন করা হয়। সকাল থেকে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল বাড়তি উৎসাহ। শিক্ষকরা ক্লাসে প্রবেশের পরই তাঁদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংগ্রহ করা উপহার তুলে দেয় প্রিয় শিক্ষকদের হাতে।
এ সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাসি-আনন্দ ও শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। কোনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষককে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়েছে, কোথাও হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে হাতে লেখা শুভেচ্ছা কার্ড। আবার কোথাও চকলেট ও কলমের মতো ছোট উপহারের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে ভালোবাসা।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ.টি.এম. তোহা, সহকারী প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি পাল এবং সিনিয়র শিক্ষক আবদুল মোতালেব, মাওলানা মাহবুবুর রহমান, নুরুল আবছার, সরোজিত দাশ, শাহনাজ বেগম, নিজাম উদ্দীন ও শাহজাদী বিলকিস আকতারসহ শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
শ্রেণিকক্ষেই ভালোবাসার পাঠ
প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি দিতে ১৯৯৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
তবে পটিয়ার এই বিদ্যালয়ে দিবসটির আয়োজন যেন প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। দিনভর শ্রেণিকক্ষগুলোতে ছিল আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। শিক্ষকরা যেমন পেয়েছেন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, তেমনি শিক্ষার্থীরাও পেয়েছে শিক্ষকদের স্নেহ ও আশীর্বাদ।
পাঠদানের জন্য পরিচিত সেই শ্রেণিকক্ষগুলোতেই এদিন যেন অন্যরকম একটি পাঠ হয়েছে—শ্রদ্ধার, ভালোবাসার এবং কৃতজ্ঞতার। ছোট্ট একটি ফুল কিংবা সামান্য একটি উপহারের মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীরা বুঝিয়ে দিয়েছে, একজন শিক্ষকের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো তাঁর ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসা।




